বুধবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

নদী

আঙ্গুল পুড়েছে।বালিকা ছুঁয়েছে স্রোতের আগুন।



নদী কি অনায়াসে ধরে রাখে আগুন প্রতিবিম্ব এবং শামুক।দীর্ণ হচ্ছে
শীর্ণ হচ্ছে
ক্রমাগত শামুকের খোলে গুটিয়ে যাচ্ছে অন্তহীন জীবন।

লহরের ছন্দে ছন্দে গভীর তলদেশ থেকে উঠে আসে রূপালি শরীরের মাছগুলো।
হায় বোকা মাছ!ধরা দিলে নিকিরির লোভী জালে
পানকৌড়ির নিষ্ঠুর ঠোঁটে?


কতবার ভাবি এইসব ক্ষুদ্র জীবনের শোকগাঁথা লিখে যাবো
লিখে যাবো---উম্মাদ স্রোতের টানে নৌকা টেনে নেওয়া প্রমত্ত-নদীর নির্মমতার কথা

কী যে রহস্য নদীর
তরঙ্গ নিজেকেই অবিরত ভাঙ্গছে ঢেউয়ের ভেতরে!


একবার পিছু ফেরো নদী
দেখো
চরের বালিতে ফেলে যাচ্ছো লাল নাকফুল চুলের রিবন

ভাসানের পদ্ম-পাপড়ি পূজোর নৈবেদ্য।

অনিদ্রা

রেডিয়ামে জ্বলে মধ্যরাত।         
না ঘুম । না স্বপ্ন ।

অন্ধকারের ডানায় লুকোনো পক্ষীরাজ
ঘোড়া।দেয়ালে নিকষ-আঁধার ছায়া কেঁপে কেঁপে উঠে।
কালো চাদরের নীচে জেগে থাকে ভয়।
রাত জাগা পাখী তার বিষন্ন ঠোঁটে ছুঁয়ে গেছে ঘুমের পেয়ালা।
জানালার ফ্রেমে এক খন্ড বিনিদ্র-আকাশ;
তারাগুলো পুড়ছে অনিদ্রার আগুনে রাতভর।

জেগে থাকে শিউলির বন।তীব্র-নীল সুরের বেহালা বাজে অস্ফুট-ব্যথার হাহাকারে
সারারাত নীহারের অশ্রুকণা ঝরে ঝরে পড়ে।
দূর-গাঁয়ে মাতাল মাদল বাজে।খোঁপায় কুরচির ফুল গোঁজা রমনীরা ঘুমায় সোহাগে;
স্বপ্নের ভিতরে মহুয়ার বন---মাদলের টান।

শহরে কোথাওনা কোথাও ঠিক জাগে পানশালা।
শ্যাম্পেনের বুদবুদে-উদ্দাম রকে শান্তির ঠিকানা খুঁজে ঘুমহীন মানুষেরা।


চুমুকে চুমুকে তরল-গরল।
চুমুকে চুমুকে মৃত্যুপান।

রবিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১২

দূর যমুনার তীরে

মেঘের উঠোনে ছায়া দীর্ঘ হতে হতে অসীমে মিলায়।
ছায়ারা ফেরেনা। তবু মেলে রাখি করতল--যদি এক ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে কভু ঝরে পড়ে
আহা!
যদি বৃষ্টির জলের ভেতরে সেই একটি বিকেলের গন্ধ অবিকল
নীপবনে দোলনায় দোল খাওয়া
কাকভেজা
ভিজে অলকে জড়ানো কদম্বের রেনু ;
ফিরবেনা জানি
যদি ফেরে!
ফেরে যদি!


স্মৃতির বারান্দা থেকে দানা খুটে খুটে তুলি ছড়ুইয়ের মতো ;
গোধূলির রূপগন্ধ পাখীদের থেকে বেশী আর কে জানে
ভোরের সবুজ ঘ্রাণ
পাখীদের মতো আর কে ছড়ায় পালকে এমন মায়া
ধারালো চঞ্চুতে বিষ !

মুঠোর ভেতরে রাখি ডানার আদর।
মুঠোর ভেতরে রাখি ঠোঁটের হিংস্রতা।


দূর যমুনার তীরে বুঝি বেজেছে বাঁশরী
-----'জলকে চল...............

বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১১

শূন্যতা

বারবার গ্রাস করে অস্তিত্বহীনতার এক তমসাচ্ছন্ন বোধ।শামুকের খোলের ভিতর গুটানো মাংসপিন্ডকেই 'আমি' বলে ভ্রম হয়।এক কুয়াশামাখা আধো-অন্ধকার ভোরে আচমকা ভেসে আসা এক ঝলক বেলীর গন্ধে আচ্ছন্ন হতে হতে শূন্যতার কথা প্রবল মনে পড়ে।ডানায় তীব্র হাহাকার ছড়াতে ছড়াতে এক ঝাঁক শুভ্রবলাকা নিঃসীম আকাশের দিকে উড়ে যেতে যেতে বলে যায়--'শূন্যতার রং সাদা, কেবলই সাদা'।
জীবনতো বিনাশী নয়।সে শুধু নিজস্ব ভুল--অমৃত ঢেলেছি বিষের পাত্রে।দীর্ঘ শীতঘুমের পরে জেগে দেখি ঘরে-বাইরে আলো-আঁধারির দোলাচল।ঘরের অন্ধকারের সাথে পাল্লা দেয় জানালার বাইরের বীভৎস কালিমালিপ্ত কুয়াশার চাদর।
এই ধুলোবালি-ভীড়ের শহরে কেউ কারো বন্ধু নয়। এক নিঃসঙ্গ -বিবর্ণতাকে সংগী করে সকলেই নিমগ্ন আপন-কোঠরে।
রূপান্তরের সরল নিয়মে আমিও বদলে গেছি।'মেটাফরমসিস' এর তেলাপোকা।
আমিওতো মুখোশ খোঁজার প্রচন্ড অনুসন্ধিৎসায় মানুষের মুখ ভুলে গেছি।
মন তবু কেন সন্তাপে বারবার পোড়ে?মন পোড়ে--স্বপ্নের ভিতরে চন্দনগন্ধী খামে পাওয়া একটি নীল চিঠির বিরহে।চিঠির ভাঁজের ভিতরে ছিল এক গোছা সুরভীত জুঁই ফুল।সে চিঠির পরতে পরতে বেজে ওঠা ইমন-কল্যান,ভীম-পলশ্রীর রাগ সব আজ বিস্মরণের ধুলোর নীচে চাপা পড়ে গেছে।


যেতে যেতে কেউ ফেলে গেছে একটি ময়ুরকন্ঠী পালক।
পালকের পাপড়িতে লেখা একটি কথা--------শূন্যতা।

শুক্রবার, ২২ এপ্রিল, ২০১১

এই ভোরের প্রতীক্ষায় থাকি

মৃত্যুর পরেও কারো কারো চোখ খোলা থাকে এই সুন্দর পৃথিবীটাকে আরো অতিরিক্ত কিছুটা সময় দেখে নেবার জন্য।




ভোরের আকাশের আয়নায় চোখ রাখতেই মন ভাল হয়ে গেল।বিগত ঘুমহীন রাতের যন্ত্রণা,কালো কালো ছায়াগুলো অথবা পাঁজর বিদীর্ণ করা ছুরিকার দগদগে ক্ষতগুলোর কথা একবারও মনে পড়লনা।আমি বরং দেখি কি উন্মাতাল উল্লাসে ঘাসের উপর উড়ে বেড়ায় কমলা রঙ প্রজাপতি। কি গভীর অভিনিবেশে লাল কলাবতীর ঝাড়ে , সবুজ ঘাসের বুকে মেখে দেয় প্রেমের পরাগ।ডানায় সাদা-কালোর মিশেলে অপূর্ব ছবি এঁকে নিয়ে গাছের ডাল থেকে ডালে কখনো শ্যামল ঘাসের চাদরে নেমে আসে দু'টো দুরন্ত পাখী।চঞ্চল-বিহঙ্গ কি নাম তোমার? আমার বন্ধু হবে? প্রতিটি সকালের বারান্দায় আমি ছড়িয়ে দেবো ভালবাসার শস্যকণা।।অপার মুগ্ধতায় চেয়ে চেয়ে দেখবো দানা খুঁটে খুঁটে তোলার টুকটুকে আনন্দটুকু।

কেন যে এত দীর্ঘ হয় অনিদ্রার রাতগুলো!অভিনিবিষ্ট সতর্কতায় প্রতিটি হতাশ্বাসের হিসাব মিলাতে থাকে ।মিলাতেই থাকে।এসব চুলচেরা বিশ্লেষণের আদৌ কোন গন্তব্য নেই।সমাধান নেই।এই সব অসহ্য রাতগুলোতে প্রবল হয়ে উঠে নিজের বোধহীন-জড়ত্বের বাসনা।অহিফেনের তীব্র ঘোরের ভিতরে পালিয়ে যাবার ইচ্ছা প্রচন্ড হয়ে ওঠে।

প্রতীক্ষায় থাকি একটি প্রখর ভোর এসে তার নির্মল আলোয় আবার ভরে দেবে মৃত্যু- ছোঁয়া চোখ দু'টো।


প্রতীক্ষায় থাকি........................................................................

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল, ২০১১

নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ নিয়ে কিছু কথা

বাসার সামনের রাস্তার ওপারে অট্টালিকা নির্মাণের কাজ চলছে।কেউ ইট ভেঙ্গে টুকরো করছে কেউবা বালি-সিমেন্টের মিশ্রন তৈরি করছে,কেউ কেউ সেইসব মিশ্রনের গামলা করে মাথায় নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছে নির্মানাধীন ভবনের একেবারে উপরের শেষ সীমানা পর্যন্ত।এসবই নিত্য-নৈমিত্তিক দৃশ্য।এরা নির্মাণ-শ্রমিক।রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-জল উপেক্ষা করে প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওদের এই রুটিন।এটাই ওদের জীবিকার উপায়।এর ব্যত্যয় হলে চুলায় হাঁড়ি চড়বেনা।খাবার জুটবেনা ক্ষুধার্ত শিশুগুলোর মুখেও।যুগ যুগ ধরেই জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ ঘর থেকে বাইরে,দেশ থেকে দেশান্তরে যাচ্ছে।সেখানে নতুনত্ব কিছুই নেই।নতুন যা তা হলো এই শ্রমিকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে নারী-শ্রমিক।কোথায় নেই এই নারী-শ্রমিক?কলকারখানা ( বিশেষ করে পোষাক-নির্মাণের কারখানাগুলোতে),হোটেল-রেস্টুরেন্ট,রাস্তায় ফেরি করে জিনিস-পত্র বিক্রি,কাঁচা বাজারে সবজি বিক্রি,বাসাবাড়ির কাজ,পুরুষের মেসের রাঁধুনীর কাজ সবকিছুতেই আছে এই নারী-শ্রমিকেরা।এদের কেউ বিধবা,কেউ স্বামী পরিত্যক্তা( স্বামী অন্য বঊ নিয়ে থাকে খরচ-পত্র দেয়না বাচ্চাদের জন্যও না এমন গল্প খুব সাধারণ),স্বজনহীন(বাবা-মা নেই ভাইরাও দেখেনা ), আবার অনেকেই আছে স্বামী অসুস্থ কাজ করতে পারেনা।এদের প্রায় সকলেরই একাধিক সন্তান-সন্ততি আছে।এদের ছাড়াও নারী-শিশু বা অল্পবয়সী নারী কর্মীদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।পোশাক-নির্মাণের কাজে এইসব অল্পবয়সী নারী-কর্মীদের দেখা যায় বেশী।
এরা কিন্তু এই শহরের আদি-বাসিন্দা নয়।এককালে হয়তো কোন সুজলা-সুফলা গ্রামের লক্ষীমন্ত বধু হয়ে মাথায় ঘোমটা টেনে আপন ঘর-গেরস্থালির টুকটাক কাজেই কেটে যেতো তার সারাটা দিন ।গ্রামের ডানপিটে মেয়েটি সারাদিন এ বাড়ী- বাড়ী ঘুরে বেড়াতো।আজ আর সেই ঘর নেই--সেই বসত-ভিটা নেই।যান্ত্রিক শহরের এক যন্ত্রমানব হয়ে সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনিতেই কাটে তার দিন।কাজের শেষে ঘর বলতে নোংরা বস্তির আলো-বাতাসহীন একটা আশ্রয়।তাও এইসব বস্তির একটা সম্পূর্ণ ঘরের মালিকানা আছে যার সে অনেক ভাগ্যবান।বস্তির একটা ঘরকে ভাগাভাগি করে ৩/৪টা পরিবার মিলে থাকে এমন মানুষের সংখ্যাই বেশী।সারাদিন পুরুষের সাথে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে ----দিনের শেষে বিশ্রামের জন্য নেই তার কোন আলাদা নির্জনতা যাকে আমরা ভাগ্যবান শিক্ষিতজনেরা 'প্রাইভেসী' বলে আখ্যায়িত করে থাকি। এছাড়াও ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন-যাপন করা নারীরা,শিশুরা যাদের রাত কাটে খোলা আকাশের নীচে হয়তো কখনো কোন বারান্দায় নাহয় ফুটপাতে। এই হতদরিদ্র মানুষগুলো পর্দা-বেপর্দা,পরপুরুষ,বেগানা , এইসব নিয়ে মাথা ঘামানোর অবকাশ পায়না।এদের ধর্ম রক্ষা করার দায়িত্ব নেননা কোন ধর্ম-প্রাণ নেতা। এইসব হতভাগা মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা কিন্তু রাষ্ট্র এবং সমাজ উভয়েরই।
রাষ্ট্র যখন একটি অবহেলিত জনগোষ্ঠির-( এখানে জনগোষ্ঠি বলতে নারীকেই বোঝাচ্ছি যেহেতু মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশী নারী হওয়া সত্ত্বেও পুরুষপ্রধান সমাজের নানা বৈষম্য এবং অবহেলার শিকার)উন্নয়নের কথা বলে তখন স্বাভাবিকভাবেই আশাবাদী হয়ে উঠি। আশাবাদী হয়ে উঠি বিশেষতঃ এই হতদরিদ্র নারী-সমাজের কথা চিন্তা করেই উন্নয়নের ধারায় যদি এরা জীবন-যাপনের মৌলিক চাহিদাগুলোতে খানিকটা সহায়তা পায়।
মন খারাপ হয়ে যায় তখনই যখন দেখি হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নারীর উন্নয়নের এই ধারাতে বাধা সৃষ্টি করে কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ। এমনকি পবিত্র ধর্মগ্রন্থকে ব্যবহার করা হয় রাস্তায় পিকেটিং করার হাতিয়ার হিসেবে(প্রতিটি মুসলিম পরিবারে অন্ততঃ একটি কোরআন শরীফ থাকে এবং একে রক্ষণাবেক্ষন করা হয় সর্বাধিক মর্যাদায়----এমনকি ওযু ছাড়া স্পর্শ করাও যায়না)।
নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ বাস্তবায়নে বাধাদানকারী ভদ্রলোকদের কাছে দাবী আগে হতদরিদ্র নারী সমাজের ইজ্জ্বত-আব্রু -ধর্মীয় অনুশাসন মানার মতো সুযোগ এবং পরিবেশ নিশ্চিত করে দেন ----তারপরে অন্য কথা।

মঙ্গলবার, ৯ নভেম্বর, ২০১০

নিগড়-বন্দী

ভাল আছি।কুশলজিজ্ঞাসার  উত্তরে এমন বলতেই হয়।এটাই ভব্যতা।
সভ্যতার হাত ধরে মুছে ফেলি সরল স্বীকারোক্তিগুলো।

হাইরাইজের খাঁচার ভিতরে স্মৃতিতাড়িত বিনিদ্র রাত।
ভুলে গেছি প্রথম বৃষ্টির সোঁদাগন্ধ।
টিনের চালে বর্ষণের ঝমঝম করতাল ঘুমের মদিরা।
"বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল........................"
শ্রাবনের ভরা গাঙ্গে ভেসে যাওয়া পদ্মপাতায় আঁকা পায়ের ছাপ;অভিজ্ঞান।
বকুল তলায় জেগে উঠা ভোর
ডাকপিয়নের প্রতীক্ষা্য মন আনচান করা প্রহরগুলো।


ভাল নেই---বলতেই ওষুধ আর অসুখের গন্ধ।হাসপাতাল।ডেটলফিনাইল।করুণার আর্তি।
ভাল লাগেনা---প্রিয়জনের উৎকন্ঠিত মুখ,  ব্যাকুল জিজ্ঞাসা।তাই সারাক্ষণ ভাল থাকি।


প্রতিরাতে ঘুমের দরোজায় প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে আটপৌরে যন্ত্রণাহতাশা।
মন্ত্রের মতো প্রবোধবাক্যে সান্ত্বনা খুঁজি-------------------------
কোন এক শিশির ভেজা ভোরে কুয়াশার চাদর গায়ে হেঁটে যাবো দূর গাঁয়ের অচেনা পথে
সবুজ ঘাসের বুকে ঝরে পড়া নীহারের ফুল কুড়োতে কুড়োতে যাবো
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে মেখে নেবো সর্ষেক্ষেতের ঘ্রাণ
নাগরিক বিষগন্ধ পিছনে ফেলে বহুদূর চলে যাবো।আর ফিরবোনা।

অনিদ্রার এমনতরো কঠিন শপথবাক্য  দিনের আলোয় মুছে ফেলে দিনযাপন করি।
কোথাও যাইনা।শিকলে বেঁধেছি পা।শিকল খুলেনা।